আমার আমি

‘আশ্চর্য অনুভূতির আখরে লেখা নাম’
জসীমউদ্দীনের আসমানি কবিতার একটা লাইন ছিল, বাড়িতো নয় পাখির বাসা ভেন্না পাতার ছানি,
একটুখানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি। এই লেখার ঘরখানা আমি খুব ভালো ভিজ্যুয়ালাইজ করতে পারতাম। বৃষ্টি হলেই আমাদের ঘরেও টুপটাপ পানি পড়ত। কাঁচা মাটির মেঝে আর পাতার বেড়া স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে যেতো। আমরা তখন বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে আমাদের পাঠ্য বইগুলো প্ল্যাস্টিকের বস্তা দিয়ে বানানো বাজারের ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতাম। আম্মা বলতেন, ‘ওই ব্যাগে কাইল মাছ আনছস, বইয়ের থেকে মাছের গন্ধ আইব’।
আমি বলতাম, মাছ আননের পর আবার গিয়া স্কুলের কদম গাছ থেকে ব্যাগ ভইরা কদম ফুল পাইড়াও আনছি। আসলে বইয়ের থেকে কদম ফুলের ঘ্রাণ আসবে। মাছের না’।
আম্মা বলতেন, ‘কদম ফুলের আবার ঘ্রাণ কী রে? এই ফুল হইলো চির দুঃখী ফুল, এই ফুলের না আছে ঘ্রাণ, না এই ফুল দিয়া মালা বানানো যায়। ফুলে যদি মালাই না হইল, সেই ফুলের মূল্য কী?’
মূল্যহীন কদম ফুল তার মূল্য বোঝাতে পারেনা। পরদিন বই বের করলে মাছের আঁশটে গন্ধে বমি চলে আসে। বইগুলো আমি রোদে শুকাতে দেই। হাওয়ায় মেলে দেই। তারপর বাংলা বইখানা এক দু’পাতা খুলে দেখি। সমস্যা হচ্ছে, বাংলা বই ছাড়া আর সব বই থেকে শেষ পর্যন্ত ওই মাছের আঁশটে গন্ধই আসে। অঙ্ক, ইংরেজি, সমাজ, বিজ্ঞান, সব বই থেকেই। যতই তা কদম, কেয়া, চাঁপা, জুই দিয়েই মুড়ে রাখিনা কেন! কারণ, বাংলা বইতে গল্প থাকে। গল্প। আমার গল্পের ভীষণ নেশা।
ছোট্ট পাখির বাসার মত ঘর। ঝড়-জলে নড়বড় করে। সেই ঘরে গল্পের বই রাখা বিলাসিতা ছাড়া কিছু নয়। আমাদের বিলাসিতা করার মত অবস্থা নেই। কিন্তু আমার মন যে মানে না! আমার কেবল গল্প শুনতে ইচ্ছে করে। বাড়িতে নতুন কেউ এলেই আলগোছে তার গা ঘেঁসে বসি, তারপর ফিসফিস করে বলি, ‘একখানা কেরছা (গল্প)) হুনাইবেন?
আমার এই কেরছা শোনানোর যন্ত্রণায় সকলে অতিষ্ঠ। রাতে আমার কাছে কেউ শুতে চায়না। আমি রাত জেগে কেরছা শুনতে চাই। তবে শেষ ভরসা শেষ পর্যন্ত আম্মাই। দুই ভাইকে দুই পাশে রেখে অবিরাম গল্প বলে যান। সেসব গল্পের বেশিরভাগই তাৎক্ষনিক মুখেমুখেই বানানো। কারণ, এক গল্প দু’বার বলতে গেলেই আমি আর শুনব না। আমার পুরনো গল্প শুনতে ভালো লাগেনা। আমার নিত্য নতুন গল্প চাই। আগের কোন গল্পই আমি ভুলিনা। কিন্তু এতো এতো নতুন গল্প আম্মা পাবেন কই?
সেবার জ্বর হলো খুব। আমি বিছানায় শুয়ে গোঙাচ্ছি। সারাক্ষণ আম্মার আঁচল টেনে ধরে পাশে বসিয়ে রাখছি। যেন আম্মার আঁচলের ঘ্রাণে আমার জ্বর সেরে যাবে। কিচ্ছু খেতে পারি না। চারপাশ জুড়ে যেন মাছের উৎকট আঁশটে গন্ধ। খাবার দেখলেই বমি চলে আসে। আম্মা বাংলা বইখানা আমার হাতে তুলে দেন। আমি পাতা উল্টাই। গল্প দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে যায় যদি!খানিক শরীরও। কিন্তু হয়না। এই সব গল্পই আমার পড়া। পড়া গল্প আর কতবার পড়া যায়! আমার পড়া গল্প পড়তে ভালো লাগেনা।
সন্ধ্যায় বার দুই বমি করলাম। শুনে পাশের বাড়ির এক বড় আপা এলেন থার্মোমিটার নিয়ে জ্বর মাপতে। তিনি তখন ডিগ্রীতে পড়েন। তার হাতে একখানা বই। মাঝখানে পৃষ্ঠা ভাঁজ করে চিহ্ন রাখা। আম্মাকে বললেন মাথায় জলপট্টি দিতে। অন্ধকারে কেরোসিনের কুপি নিয়ে পুকুর থেকে জল আনতে গেলেন আম্মা। সাথে আপাও। তার বইখানা আমার পাশে রাখা। আমি পাতা ওল্টালাম। এক পাতা, দুই পাতা, তিনি পাতা। তারপর ওল্টাতেই থাকলাম। তারপর আম্মা এলেন, মাথায় জলপট্টি দিলেন। বড় আপা বইখানা চাইলেন। আমি তাকালাম না অবধি। আম্মা সম্ভবত চোখের ইশারায় তাকে বইখানা রেখে যেতে বললেন।
তারপর ঘোরগ্রস্ত এক কিশোরের জগত ও জীবন ডুবে যেতে থাকল এক অদ্ভুত বিস্ময়ে। সেই বিস্ময়ের নাম ‘হুমায়ূন আহমেদ’। আমি বইখানা শেষ করলাম। আমার চোখের কোল বেয়ে তখন গড়িয়ে পড়ছে জল। আমি সেই জল মুছে বইখানা উল্টেপাল্টে দেখলাম। বইয়ের নাম ‘অপেক্ষা’। রাতে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো, ঝড়ো হাওয়ায় ঘর নড়বড় করছে। আম্মা পাশে বসে উৎকণ্ঠিত চোখে তাকিয়ে আছেন। কেরোসিনের কুপির আলো থরথর করে কাঁপছে। সেই কম্পমান আলোয় আমি বইখানা আবার পড়তে শুরু করলাম। তারপরদিন আবার। তারপর আবার। শোনা হয়ে যাওয়া, কিংবা পড়া হয়ে যাওয়া গল্প আর শুনতে বা পড়তে না চাওয়া সেই একগুঁয়ে কিশোর ডুবে যেতে থাকল একটি মাত্র গল্পে, একটি মাত্র বইয়ে, বারবার, বারবার, বারবার। সেই ডুবে যাওয়া থেকে তার আর ভেসে ওঠা হলো না। একজন হুমায়ূন আহমেদ তাকে অন্য এক গল্পের জগতে বুঁদ করে রাখলেন। বইয়ের পর বই। গল্পের পর গল্প। বুকের ভেতর অজস্র প্রজাপতির উড়ে যাওয়া ডানায় লিখে দিতে থাকলে জীবন ও জগতের অজস্র জিজ্ঞাসা আর উত্তর। তীব্র অনুভূতির আখ্যান। কেয়া, চাঁপা, জুই, আর কদম ফুলের সুবাসে ক্রমশই ভরে যেতে থাকলো বুকের উঠোন। গভীর স্পর্শে তিরতির কেঁপে উঠতে থাকলো মনের গহীন।
সেই গহীনে চিরন্তন অনুভূতির আখরে লেখা এক আশ্চর্য নাম হয়ে রইলেন হুমায়ূন আহমেদ!

মন্তব্যসমূহ

সময়ের সেরা লেখার কানেকশন

বড় বোন

ভালবাসা

সুখ এবং পরিবার